Slideshows

http://www.bostonbanglanews.com/index.php/modules/mod_news_pro_gk1/components/modules/mod_news_pro_gk1/style/templates/gk_twn/media/system/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

খসরুজ্জামান চৌধুরী : একাত্তরের স্মৃতি = নির্মলেন্দু গুণ

রবিবার, ১৬ জুলাই ২০১৭

কিশোরগঞ্জ তখনও পর্যন্ত মুক্তাঞ্চল। আমি অনেকের মুখেই কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় এসডিও (মহকুমা প্রশাসক) জনাব খসরুজ্জামান চৌধুরীর সুনাম শুনতে পাই। কিশোরগঞ্জ থেকে নেত্রকোণা পর্যন্ত কীভাবে যাবো তাই নিয়ে যখন ভাবছি, তখন বাবুর এক বন্ধু আমার সাহায্যে এগিয়ে আসে। আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোটো হলেও তরুণটি দারুণ সাহসী। একনিষ্ঠ মুজিব সৈনিক। নাম ভুলে গেছি। সত্যি বলতে কি ওর চেহারাটাও ঠিক মনে করতে পারছি না। আমার হুলিয়া কবিতাটি সে পড়েছে এবং কবিতাটি নাকি তার খুব ভালো লেগেছে। সেকারণে সে আমাকে মোটর সাইকেলে করে নেত্রকোণা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রাজি। তার একটাই শর্ত, কিশোরগঞ্জ থেকে নেত্রকোণা আসা যাওয়ার জন্য পেট্রোল জোগাড় করার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে। তখন খোলা বাজারে পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছিল না। কিশোরগঞ্জের এসডিও সব পেট্রোল অধিগ্রহণ করে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত কাজেই শুধু ঐ পেট্রোল ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থির হলো, আমি কাল সকালে আমার কবিতার বই প্রেমাংশুর রক্ত চাই হাতে নিয়ে মাননীয় মহকুমা প্রশাসকের কাছে গিয়ে তাঁকে বলবো, আমার ভ্রমণকষ্ট লাঘব করার জন্য কিছু পেট্রোল চাই। বাবু বললো, ভদ্রলোক খুব সাহিত্যামোদী, সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাঁর স্ত্রীও লেখেন। উপস্থিত সবারই ধারণা, প্রয়োজনীয় তাঁর কাছে গেলে তিনি আমাকে খালি হাতে বিদায় করবেন না। আমাকে নিশ্চয়ই পেট্রোল দেবেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, কলকাতার আকাশবাণী ও বিবিসি-র সংবাদ শুনে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে ইতিমধ্যেই অওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার সমর্থক রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেছেন এবং ঐ তালিকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। তাতে মুক্তিযুদ্ধে গতির সঞ্চার হচ্ছে। ভারত সরকার গণহত্যা চালানোর জন্য পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লোকসভায় নিন্দা-প্রস্তাব এনেই ক্ষান্ত হয়নি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করার প্রয়োজনীয় অনুমতিও দিয়েছেন। পাকিস্তানী বিমান আমাদের মুক্তাঞ্চলগুলো নিজেদের দখলে নেবার জন্য তাদের পদাতিক বাহিনীকে যত সাহায্যই করুক না কেন, তাতে তাদের যতই আপাতসাফল্য আসুক না কেন, অত্যাচারী পাকিস্তানী কংশরাজকে বধিবে যে, ভারতে গোপনে বাড়িছে সে। আপাতত কিছুটা গোপনীয়তা রক্ষা করে চললেও, ভারতীয় জনগণের ক্রমবর্ধমান সমর্থন ও কংগ্রেস শাসিত ভারত সরকারের ভূমিকা দৃষ্টে বোঝা যাচ্ছিল যে, অচিরেই সেই গোপন আঁচলখানি ঝরে যাবে, উড়ে যাবে এবং একসময় পুরোপুরি খসে পড়বে।
গভীর রাত পর্যন্ত নন্দীবাড়িতে আগত মানুষজনকে আমার নরক থেকে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা বলতে হলো। বলতে পেরে আমারও ভালো লাগলো। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য সম্পর্কে যাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল, তারা তাদের মনের সকল সন্দেহবিন্দু পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের জলে বিসর্জন দিয়ে মহানন্দে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেলেন। আমার মনে হলো, মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও তার সাফল্যের সম্ভাবনার দীপশিখাটিকে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখাটাই কবির কাজ। আমার পক্ষে মেজর জিয়া, মেজর খালেদ মোশাররফ বা মেজর শফিউল্লাহর মতো প্রত্যক্ষসমরে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। খসরু-মন্টুদের মতোও না। আমার সেরকম প্রশিক্ষণও নেই, সেই মানসিকতাও আমার নয়। তারপরও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ময়দানে আমি অস্ত্র হাতে লড়াই করছি, আমার গোলাগুলিতে মুছুয়া-পাকসেনারা (চরমপত্রে এম আর আখতার মুকুল পাকসেনাদের এভাবেই বর্ণনা করেছেন) কাতারে-কাতারে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে; তাদের দেহচ্ছিন্ন মুছুয়ামস্তকগুলি গড়াগড়ি খাচ্ছে আমার ধাবমান রথের তলায় এরকম ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে আমার নিদ্রা ভেঙেছে। কিশোরগঞ্জে ঐ রাতে আমি ঠিক কী স্বপ্ন দেখেছিলাম, মনে পড়ে না। বাস্তবে ঘটে যাওয়া কতো ঘটনার কথাই ভুলে গেছি, স্বপ্নের ওপর আর ভরসা কী?
পরদিন ৫ এপ্রিল, সোমবার, সকাল দশটার দিকে আমি কিশোরগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক জনাব খসরুজ্জামান চৌধুরীর কাছে যাই। অত্যন্ত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও আমাকে তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন। তিনি জানান যে, আমার কিশোরগঞ্জে আগমনের খবর তিনি তাঁর গোয়েন্দাবাহিনীর মাধ্যমে কালই পেয়েছেন। আমি যে কবি, আমার কবিতার বই দেখিয়ে তা প্রমাণ করতে হলো না। তিনি বললেন আমার কবিতা তিনি পড়েছেন। বললেন, তাঁর স্ত্রী তাহমিনা জামানও লেখেন। আলাপকালে আমাদের মাঝে উপস্থিত খসরুজ্জামান চৌধুরী সাহেবের শ্যালক গালিবও (প্রাক্তন সচিব, লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মাধ্যমে সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়) আমাকে মুখোমুখি পেয়ে মহা খুশি। গালিব বললো, আমিও আপনার কবিতার ভক্ত। আমার যাত্রাপথের প্রয়োজনীয় পেট্রোল পেতে মোটেও অসুবিধা হলো না।
ঐ দিনের কথা জানবার জন্য আমি বর্তমানে আমেরিকার লুসিয়ানায় বসবাসরত প্রফেসর ডক্টর খসরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে আন্তর্জালে (ইন্টারনেট) যোগাযোগ করি। তাঁর আন্তর্জাল-ঠিকানা পেতে আমাকে সাহায্য করেন নিউইয়র্ক প্রবাসী কবি-সাংবাদিক ফকির ইলিয়াস ও ড. বিমলচন্দ্র পাল। আমার একটি ছোট্ট পত্রের উত্তরে প্রফেসর চৌধুরী আমাকে যে দীর্ঘ পত্রটি লিখেছেন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁর অনুমতিক্রমে আমি পুরো পত্রটিই এখানে পত্রস্থ করছি।

Here are some of the answers to your questions. My wife recollects her meeting with you at Bangla Academy, when you gave her a copy of one of your books. 'Dukkho Korona- Bacho' on 22 February 1989! She sends her best wishes. Same from me. Please acknowledge the reciept of this email, so that I know you recieved my answers and related observations.
First about myself. During 1971-1972, I acted as Deputy Commissioner of Greater Mymensingh. Then I worked as Deputy Secretary first in Relief and Rehabilitation (1972-1974) then in Education (1974-1977). I was the first Secretary of the reconstituted Bangladesh National Commission for UNESCO. I graduated from Harvard University, USA with a Master in Public Administration (MPA) degree in 1978 (1977-1978) and from Syracuse University, USA with a Ph.D degree in Economics in 1987 (1983-1987). I resigned from Govt. Service in 1980.

Here are answers to your questions. I do recollect you met me in my residential office on April 5, 1971. Because petrol was in shortage, I had to control it. I remember to have given you some petrol. I do recollect the boy, but I do not certainly recollect his name. I believe his name was Babul. Yes, my brother-in-law Galib was with me. He stayed with me throughout the Liberation war. Earlier, in late March, I had sent off my wife Tahmina Zaman from Kuliarchar in a passenger launch-off to a safer destination- with my 8 month old Sal, Faisal (who is now a young man and works as a Marketing Director in a USA company in San Diego, California!) I thought their presence with me restricted my ability to work harder, and free of extra worries, for the war activities. To stop the advancement of the Pakistan Army, I destroyed some important bridges in and around Kishoreganj.
What happened next was that Bhairab, under my jurisdiction, fell to Pak Army although we had destroyed part of the bridge. Captain Nasim (now retired Chief of Staff) and others fought so hard at Bhairab but could not save it! I was constantly in touch with Bhairab when the battles were going on there. Bhairab fell to Pak Army probably in April 10, 1971. I got news that Pak Army was advancing towards Kishoreganj-they had come upto Sararchar, only about 20 miles from Kishoreganj!!
That was the big decision moment! I had to decide what to do. I had assured the people of Kishoreganj that if I left, I would let them know in advance. I must keep my promise. Kishoreganj was not safe any more, and I could not protect anyone any more!
I took decisions which my conscience dictated. I paid three months advance salaries to all SDO's office employees, violating all Govt rules!! I asked them to leave town and go to safer places. Under my instruction, microphone announcement was made all over the town that the SDO (that is, me!) could no longer provide protection to anyone and everyone should seek proper safer shelters! It was also announced that I would also leave at the appropriate time.
The time finally arrived. Someone rushed from Sararchar to warn me. I then left in the night of April 17. I left in my official jeep, the SDO's jeep.
My companions were my brother-in-law Galib, my driver Subodh and his family (wife and 2 children). I took them with me because I feared for their lives!! We went to Netrokona with great hardships. I was stopped several times!! At one point, villagers were almost attacking us, thinking that we were Pakistanis!!
I reached Netrokona the next day. My CSP batchmate Abdul Hamid Chowdhry (Retired Secretary, Govt. of Bangladesh) was then SDO, Netrokona. I urged him to come with me to Meghalaya. Finally, my companion and I reached Baghmara on Indian side after crossing the treacherous Kongsho river,. We left our jeep behind and walked into India. I was recieved by BSF who provided me with a shelter! I heard later that Kishoreganj fell to the Pak Army probably on April 22, 1971.
This is part of my story and part of history!! My wife and I have written in Bangali (and some English)many episodes on the Liberation war days and events: Next time we are in Dhaka, we will contact you and share those moments. Poet Shelley so rightly wrote:
'Our sweetest songs are those that tell of saddest thought'!

Many people want to publish my book on the war. Maybe I should write soon! (I have my diaries).
I am very very busy. Yet I thought I must honor your request. Waht I am sending you is in a rush- probably somewhat disorganized.
I am in tears as I am writing you these lines. You threw me into the past, a past which still haunts, and pleases me even in my dreams. I love Kishoreganj and I love Bangladesh. Bangladesh is in my blood- oi desher shonge amar narhir shomporko!! I can never forget. I only pray for the country and its real people!
Once again, I am grateful that I was lucky enough to be in your thoughts. To me, this is a great pleasure; and also a great treasure.
I am a professor now. I must thank my Ph.D. Student who is kindly sending this email for me. (I cannot type long emails!!)
Wishing you all the best.
Yours Sincerely,
Khashruzzaman Choudhury

সত্যি বলতে কি, মুক্তিযুদ্ধের কাজে অধিকতর মনোযোগ এবং সময় দেবার উদ্দেশ্যে আপনি আট মাসের পুত্রসহ আপনার প্রিয়তমা পতœীকে দূরগামী লঞ্চে তুলে দিয়ে আপন কর্মস্থলে ফিরে আসার ঘটনাটি মনের আবেগ লুকিয়ে আপনি এমন নির্লিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে মনে হয়েছে, দেশকে পাকবাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করার প্রয়োজনে আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করাটা আপনার কাছে স্ত্রী ও সন্তানের চেয়ে তখন কম প্রিয় বলে মনে হয়নি।
‘চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
 ক্ষুদ্র দুঃখসব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে।’

আপনার পত্রপাঠের পর থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের এই কথাটা আমার মনে বারবার গুনগুনিয়ে উঠেছে। মহামতি লেনিন বলেছিলেন, বড় প্রয়োজন সামনে এসেছে, ছোটো প্রয়োজন ছাড়তে হবে। বঙ্গবন্ধুর মতো আত্মস্বার্থবিসর্জনকারী নেতার একজন যথার্থ যোগ্য অনুসারীর মতোই ১৯৭১ সালে আপনি তা করতে পেরেছিলেন। তাই পাকসেনাদের আগমনী সংবাদ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে সরে যাবার আগে শহরবাসীকে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে মাইকযোগে সতর্ক করতে আপনি যেমন ভুল করেননি, তেমনি ভারতে আশ্রয় গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে কিশোরগঞ্জ ত্যাগের সময় আপনার গাড়ির চালক সুবোধের স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানকেও আপনার জিপে তুলে নিতে আপনি ভুল করেননি। পাকসেনাদের নির্বিচার হিন্দু-নিধনের পরবর্তী নীল নকশা নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে যে মতবিনিময় করেছিলাম, আপনার গৃহীত সিদ্ধান্ত দৃষ্টে মনে হয়েছে, আপনিও তার সত্যতা সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাদের বাঁচানোর তাগিদ বোধ করেছিলেন। অন্যথায় আপনার ছোট্ট জিপে সুবোধের পরিবারের সদস্যদের স্থান সংকুলান হতো না।
আপনার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে আপনার মিলনপর্বটি কবে, কীভাবে সম্ভব হয়েছিল, অনেক পাঠকের মতো আমার নিজেরও তা জানবার খুব আগ্রহ রয়েছে। আপনার শ্যালক গালিব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুরো সময় জুড়ে আপনার সঙ্গে ছিল, আপনি তা আমাদের জানিয়েছেন। তবে কি, আপনার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আপনার আর দেখাই হয়নি?
আমার চলমান রচনাটির সঙ্গে আপনাকে যুক্ত করার চিন্তাটি এরকম সুফলদায়ক হবে, ভাবিনি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, কী জানি, অন্তরাল থেকে কোনো অদৃশ্য শক্তি বোধহয় আমাকে বুদ্ধি জোগাচ্ছে। তা না হলে, আমার তো এতো বুদ্ধি, এতো ধৈর্য পূর্বে কখনও ছিল না। আমি যেন আমার ভিতরে একটি নতুন আমি’র অস্তিত্ব অনুভব করছি।
‘অন্তরমাঝে বসি অহরহ
মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,
মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ
মিশায়ে আপন সুরে।
কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই,
তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,
সঙ্গীতস্রোতে কূল নাহি পাই
কোথা ভেসে যাই দূরে।’
(আত্মúরিচয় : রবীন্দ্রনাথ)
কবিতা একা লেখা যায়, কিন্তু ইতিহাস বোধ করি এভাবেই, অনেকে মিলেই লিখতে হয়। অনেকের অংশগ্রহণের ভিতর দিয়েই ইতিহাস সত্য হয়ে ওঠে। পূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘আত্মকথা-১৯৭১’ লিখতে বসে এই শিক্ষাটাই আমার জানা হলো।
তথ্যপ্রবাহের এই স্বর্ণযুগে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আপনার কাছে আমাকে পৌঁছতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদের কথা আমি আগেও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছি, আবারও করছি।
জনাব মহিউদ্দিন আহমদ সম্পর্কে পাঠককে কিছু তথ্য জানানো প্রয়োজন বোধ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়াকালে জনাব খসরুজ্জামন চৌধুরী জনাব মহিউদ্দিন আহমদের চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছিলেন, কিন্তু কর্মজীবনে তাঁরা দুজন ছিলেন একই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের (১৯৬৭)। জনাব মহিউদ্দিন আহমদ পাক-সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে আয়োজিত একটি জনসভায় উপস্থিত (১ আগস্ট ১৯৭১) হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের নতুন আবেগ যুক্ত করেছিলেন। ইউরোপের পাকদূতাবাসগুলিতে দায়িত্ব পালনরত বাঙালি-কূটনীতিকদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন তিনিই প্রথম। তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনিও ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসেই তাঁর পাকপক্ষ ত্যাগ করার ঘোষণাটি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রবাসী সরকারের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে ইউরোপ ভ্রমণরত বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী নিবৃত্ত করায় তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।
৭ মার্চের দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়া শত্র“র মোকাবিলা করতে হবে...।’ এই ‘যার যা আছে’ কথাটা এখানে খুবই প্রণিধানযোগ্য। পাক-সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন বাঙালিদের বেলায় বঙ্গবন্ধুর ঐ কথাটার তখন একটাই মাত্র অর্থ ছিল, তা হলো, পূর্ববাঙলা-শোষণকারী ও শ্মশানকারী পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করা।   
জনাব খসরুজ্জামান চৌধুরী বা জনাব মহিউদ্দিন আহমদ ছিলেন পাকিস্তান সরকারের উচ্চপদে আসীন অকুতোভয় বাঙালি, যাঁরা পাক-প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বা পূর্ব বাংলার গভর্নর জল্লাদ জেনারেল টিক্কা খানের ভয়ে বা নিরুদ্বিগ্ন জীবনযাপনের লোভে বা পিয়ারে পাকিস্তানের প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা অবশিষ্ট থাকার কারণে তাঁদের বিবেকবুদ্ধিকে পাক-সেনাদের বুটের তলায় লুটিয়ে দেননি। তাঁরা পূর্ব বাঙলার বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে প্রদত্ত নির্দেশকে শিরোধার্য করে তাঁদের নর্মজীবন, মর্মজীবন ও কর্মজীবনের ওপর ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আমার ‘আত্মকথা ১৯৭১’-এ প্রফেসর চৌধুরীর মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরে আমি আমার অন্তরে গভীর আনন্দ বোধ করেছি। মনে করছি, জনাব খসরুজ্জামান চৌধুরী বা জনাব মহিউদ্দিন আহমদের মতো আরও যাঁরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন, এই দুজনের মধ্য দিয়ে তাঁরাও আমার রচনায় সগৌরবে অন্তর্ভুক্ত হলেন। বাঙালি চিরদিন তাঁদের ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।